স্মৃতির পাতায় হারিয়ে গেলেন আরেক সহযোদ্ধা
সাবেক হকি তারকা রিপনের মৃত্যুতে শোকাহত আবাহনী পরিবারের প্রাক্তন খেলোয়াড়রা
সকালের শুরুটা ছিল অন্য দিনের মতোই। ঘুম থেকে উঠে স্বাভাবিকভাবেই মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে মেসেজগুলো দেখছিলাম। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে দোলন ভাইয়ের একটি মেসেজ চোখে পড়ল—“রিপন মারা গেছে।”
মুহূর্তের মধ্যে যেন সবকিছু থমকে গেল। কিছুক্ষণ বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল—আমাদের সেই রিপন ভাই? যার সঙ্গে মাত্র গত শুক্রবারও কথা হয়েছে! তবুও সত্যিটা জানার জন্য ফোন করলাম। তখনই নিশ্চিত হলাম—হঠাৎ স্ট্রোকে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আবাহনী হকি দলের প্রয়াত খেলোয়াড় বাম থেকে উপরে: পুশকিন,কান্চন, জুম্মান, খাজা রহমত ও জুবেল
রিপনের মৃত্যু যেন আমাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেল আবাহনীর সেই সোনালি সময়ে। সেইসব সহযোদ্ধাদের কাছে, যাদের সঙ্গে বছরের পর বছর মাঠে ঘাম ঝরিয়েছি, একসঙ্গে জয়-পরাজয়ের গল্প লিখেছি, ক্লাবের আড্ডায় অসংখ্য স্মৃতি তৈরি করেছি। আজ সেই প্রিয় মুখগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে।

আবাহনী হকি টিম ১৯৮৭
মনে পড়ে গেল পুশকিন, কাঞ্চন, রহমতউল্লাহ, জুম্মান এবং জুবেলের কথা। আজ সেই তালিকায় যুক্ত হলো রিপনের নামও। তাদের অনেকের সঙ্গেই আমি দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলেছি। তাই এই ক্ষতিটা আমার কাছে শুধুই একজন খেলোয়াড় হারানোর নয়—এটা একজন সহযোদ্ধা, একজন বন্ধুকে হারানোর বেদনা।

স্মৃতির পাতায় চ্যাম্পিয়ন ট্রফি হাতে নিয়ে বাম থেকে প্রয়াত কান্চন ও জুম্মান এবং আসির বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী ও আমি ইংল্যান্ডে। ছবি ১৯৮৯।
ভাবতে অবাক লাগে, জুবেল ছাড়া বাকিরা সবাই ছিলেন দলের বেস্ট ইলেভেনের খেলোয়াড়। আরও কষ্টের বিষয় হলো—প্রায় সবাই স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে আকস্মিকভাবে চলে গেছেন। কেউ দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও পাননি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে তাদের জীবনের গল্প।
এ যেন এক নির্মম বাস্তবতা।
আজ মনে হয়, আমাদের সেই মূল দলের প্রদীপগুলো একে একে নিভে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ছয়টি উজ্জ্বল আলো নিভে গেছে। তাদের সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে না। হবে না সেই প্রাণখোলা আড্ডা, মাঠের হাসি, কিংবা বন্ধুত্বপূর্ণ তর্ক।

অধিনায়ক মিজানের নেতৃত্বে ঢাকা আবাহনী বনাম বাংলাদেশ আর্মি খেলার পুর্বে তোলা ছবি। ছবি ১৯৮৯।
আমাদের সময় আবাহনী হকি দল শুধু একটি দল ছিল না—এটি ছিল একটি পরিবার। খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধন, আত্মসম্মান এবং ক্লাবের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। অন্য কোনো দল আমাদের ভাঙিয়ে নেওয়ার সাহসও পেত না। সবাই জানত—আমরা আবাহনীর প্রাণ, টাকার লোভে কখনো ক্লাব ছেড়ে যাব না।
অনেক সময় দলবদলের সময় ক্লাবের আর্থিক সংকট দেখা দিলে আমরা নিজেরাই টাকা দিয়ে নতুন খেলোয়াড় এনে দলে খেলিয়েছি। কারণ আমাদের কাছে আবাহনী ছিল শুধু একটি ক্লাব নয়—এটি ছিল আমাদের আত্মার অংশ।
কিন্তু আজ যখন দেখি সেই ঐতিহ্যবাহী আবাহনী নানা সংকট ও বিতর্কে জর্জরিত, তখন সত্যিই হৃদয় ভেঙে যায়। যে ক্লাবের জন্য আমরা এত ভালোবাসা ও ত্যাগ দিয়েছি, সেই ক্লাবের গৌরব ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে অনেকেই ব্যর্থ হয়েছে।

আবাহনী অধিনায়ক মিজান অতিথিদের সাথে খেলোয়াড়ের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন ছবি-১৯৮৯
আমরা যারা ৮০ ও ৯০–এর দশকে আবাহনী হকি দলে খেলেছি—তাদের মধ্যে আমি, টিসা, লিটন ও আসির বর্তমানে দেশের বাইরে আছি। আমি এখন ইংল্যান্ডে থাকলেও দেশের হকি অঙ্গনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি এবং নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে চাই।
রিপনের মৃত্যু আমাকে ব্যক্তিগতভাবে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। কারণ আমি তার সঙ্গে দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলেছি, একসঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি তৈরি করেছি।
বন্ধুরা একে একে চলে যাচ্ছে, কিন্তু তারা রেখে গেছে হাজারো স্মৃতি। একদিন হয়তো আমরাও তাদের কাতারে গিয়ে দাঁড়াবো—এটা শুধু সময়ের ব্যাপার।
ততদিন পর্যন্ত আমরা স্মৃতিগুলো বুকে ধারণ করে বেঁচে থাকবো।
পরপারে শান্তিতে থাকুন প্রিয় সহযোদ্ধা রিপন।

মিজানুর রহমান মিজান
সাবেক খেলোয়াড়, আবাহনী হকি দল (বর্তমানে ইংল্যান্ডে অবস্থানরত)

